বিশেষ প্রতিনিধি (গাজীপুর)
দোহা থেকে লাস ভেগাস—৬২ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালেন টঙ্গী গাজীপুরের এরশাদনগরের শ্রেষ্ঠ কোচ
পিরোজপুর জেলার দক্ষিণ ভাণ্ডারিয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ বাংলাদেশের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যুদ্ধের ময়দান থেকে ক্রীড়াঙ্গন-প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি দেশের পতাকাকে করেছেন উজ্জ্বল। ৮৩ বছর বয়সেও তাঁর শরীরে এখনো যুদ্ধের শক্তি, মনে আছে আগুনের মতো অনুপ্রেরণা। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ, যিনি ২০২৫ সালে দু’টি মহাদেশ জয় করে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন।
কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে জয় করেন রৌপ্যপদক। ৬২টি দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের পতাকা তাঁর হাতেই উড়েছে সবচেয়ে উঁচুতে। “দেশের পতাকা উড়তে দেখলেই আমার মনে হয়, জীবনের প্রতিটি পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।” বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ।
দেশপ্রেম থেকে ক্রীড়াপ্রেম—এক আজীবন সংগ্রামী জীবন, ১৯৪২ সালে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার দক্ষিণ ভাণ্ডারিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর জীবন উৎসর্গ করেন তরুণ প্রজন্মের বিকাশে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকে ভারোত্তোলন ক্যারিয়ার শুরু করে, ১৯৬৮ সালের পাকিস্তান ন্যাশনাল গেমসে বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করেন। এরপর কখনো পিছনে ফিরে তাকাননি। দেশের জন্য, তরুণদের জন্য, আর নিজ দেশের সম্মানের জন্যই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ।
এরশাদনগর ভারোত্তোলন ক্লাব: তরুণদের স্বপ্নঘর, বর্তমানে তিনি গাজীপুর সিটি র্কপোরেশনের ৪৯নম্বর ওয়ার্ডের এরশাদনগরে স্থাপন করেছেন “এরশাদনগর ভারোত্তোলন ক্লাব” যা এখন দেশের অন্যতম সফল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই ক্লাব থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আজ কর্মরত আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও নৌবাহিনীতে। “আমার কাছে যারা আসে, তারা শুধু ওজন তুলতে শেখে না, তারা শিখে কেমন করে জীবনকে জয় করতে হয়।” - মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ।
তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকে সরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন, যার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে। তিনি বলেন, “যে গরিব গ্রামের তরুণরা একসময় স্বপ্ন দেখতেও ভয় পেত, আজ তারা সরকারে চাকরি করছে—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”
দোহা থেকে লাস ভেগাস: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা। ২০২৫ সালের মে মাসে কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন; এর তিন মাস পর সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে আমেরিকা অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে অর্জন করেন রৌপ্যপদক।
বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনের চেয়ারম্যান উইং কমান্ডার (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “৮৩ বছর বয়সেও মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ আমাদের ক্রীড়াক্ষেত্রে জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি তরুণদের শেখান কীভাবে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়।”
এছাড়া ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লেফটেন্যান্ট (অব.) শহিদুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ আমাদের জাতীয় গর্ব। তাঁর মতো মানুষই দেশের মান বাড়িয়ে দেন।” ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে তিনি সাইকেলে দুই মাস ১৬ দিন ভ্রমণ করে বাংলাদেশের ১৯টি জেলা ঘুরে খেলাধুলার প্রচারণা চালান। সে সময় সরকারি অনুদানে এই ভ্রমণ সম্পন্ন হয়, যা আজও দেশের ক্রীড়াইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
২০২৫ এশিয়ান মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ, দোহা-স্বর্ণপদক, ২০২৫ ওয়ার্ল্ড মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ, লাস ভেগাস-রৌপ্যপদক। দুইবার “বেস্ট কোচ অব বাংলাদেশ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। একবার “বেস্ট অর্গানাইজার অব বাংলাদেশ”। আন্তর্জাতিক কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন: কোরিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড, কাতার, ভারত “তারুণ্যের উৎসব” ও অনূর্ধ্ব–১৭ জাতীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার মূল আয়োজক।
জীবনের দর্শন: বয়স নয়, মনোবলই আসল শক্তি “শরীর ক্লান্ত হয়, কিন্তু মন যদি সচল থাকে, মানুষ যে কোনো বয়সে ইতিহাস লিখতে পারে।” -বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ। তিনি বলেন, “যে মানুষ নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকে, আল্লাহও তাকে সফল করেন। আমি আজ যা কিছু, তা আমার দেশের জন্য।” বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদের জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেম মানে শুধু যুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই নয়, দেশপ্রেম মানে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের পতাকাকে সম্মানের আসনে ধরে রাখা।
যে মানুষ ৮৩ বছর বয়সেও লাস ভেগাসের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়ান, যে মানুষ গ্রামের গরিব তরুণদের হাতে তুলে দেন শক্তি আর আত্মবিশ্বাস-তিনি কেবল একজন ক্রীড়াবিদ নন, তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা, এক জাতির প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়-“দেশের প্রতি ভালোবাসা ও সেবার মনোভাব থাকলে বয়স কখনো সীমা নয়, বরং সেটাই হয় মহিমার উৎস।”
নাম: বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ), জন্ম: ১৯৪২, দক্ষিণ ভাণ্ডারিয়া, পিরোজপুর, বরিশাল বিভাগ। ঠিকানা: এরশাদনগর, ৪৯ নং ওয়ার্ড, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, পদবী: ক্রীড়া সংগঠক, কোচ ও সমাজসেবক, অর্জন: স্বর্ণ ও রৌপ্যপদক জয়, আন্তর্জাতিক কোচ, বেস্ট অর্গানাইজার মূলমন্ত্র: “দেশপ্রেমই জীবনের সর্বোচ্চ শক্তি।”
