Type Here to Get Search Results !
ব্রেকিং
খবর লোড হচ্ছে...

Footer Copyright

মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রয়াণ দিবস আজ: মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবীর প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা


 

মিলন বৈদ্য শুভ,রাউজান, চট্টগ্রাম (প্রতিনিধি):


আজ ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের মহানায়ক, বাঙালি বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পথপ্রদর্শক মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রয়াণ দিবস। এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে সেই মহান বিপ্লবীকে, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন একাধারে একজন শিক্ষক ও বিপ্লবী সংগঠক। শিক্ষকতা পেশার কারণে সবাই তাকে ‘মাস্টারদা’ নামে সম্বোধন করতেন। অসাধারণ সংগঠনী শক্তি, দৃঢ় মনোবল ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি চট্টগ্রামকে পরিণত করেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক শক্ত ঘাঁটিতে।

সূর্যসেনের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামে। তার পিতা রাজমনি সেন এবং মাতা শশিবালা সেন। শৈশবেই পিতামাতাকে হারিয়ে তিনি কাকা গৌরমনি সেনের তত্ত্বাবধানে বড় হন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, মনোযোগী ও গম্ভীর স্বভাবের। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময়ই ছাত্রদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগ্রত করেন এবং গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী বিপ্লবী দল।

১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর সারা ভারতে যখন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, তখন মাস্টারদা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটাতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামই একমাত্র পথ। তার নেতৃত্বে অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ বহু তরুণ বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হন।

সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৯২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিপ্লবীরা রেল কোম্পানির অর্থ লুট করে আত্মগোপন করেন। এরপর দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে মাস্টারদা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন একযোগে ব্রিটিশ অস্ত্রাগার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করার। সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ নেয় ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল—ইতিহাসে যা ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

সেদিন ৫০-৬০ জন তরুণ বিপ্লবী রেলপথ ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ধ্বংস করে ইংরেজদের অস্ত্রাগারে আক্রমণ চালান। পরবর্তীতে জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হন। শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীরা পিছু হটতে বাধ্য হন এবং মাস্টারদার খোঁজে ইংরেজ সরকার ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় মাস্টারদা সূর্যসেন ধরা পড়েন। বিচারে তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি, কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মাস্টারদা সূর্যসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি কারাগারে ফাঁসির আগে মাস্টারদার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। অমানবিক নির্যাতনে তিনি প্রায় অচেতন হয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত তাকে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে শহীদ হন তারকেশ্বর দস্তিদারও।

মাস্টারদা সূর্যসেনের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তার আদর্শ ও সাহস যুগে যুগে তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের ফলেই জাতি পেয়েছে স্বাধীনতা। আজ তার প্রয়াণ দিবসে মৃত্যুঞ্জয়ী এই মহান বিপ্লবীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শতকোটি প্রণাম।