কালিমুল্লাহ ইকবাল , টঙ্গী | ২৬ মার্চ, ২০২৬
একাত্তরের উত্তাল মার্চে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। শত্রুমুক্ত করেছিলেন প্রিয় মাতৃভূমিকে। ৫৪ বছর পর আজ ৮৪ বছর বয়সেও সেই কাঁধ নুয়ে পড়েনি বার্ধক্যের ভারে; বরং সেই কাঁধেই তিনি বিদেশের মাটিতে তুলে ধরছেন ভারোত্তোলনের (Weightlifting) ভারী সব ডিস্ক আর বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। তিনি গাজীপুর টঙ্গীর এরশাদনগরের গর্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান।
আজ মহান স্বাধীনতা দিবসে যখন সারা দেশ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করছে, তখন মজিবুর রহমান এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা, তা তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের কর্মে ও সুঠাম দেহে।
রণাঙ্গন থেকে খেলার মাঠ: ৫৬ বছরের নিরলস পথচলা
স্বাধীনতার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা যখন বিশ্রামে, মুজিবুর রহমান তখন নেমেছিলেন দেশ গড়ার অন্য এক যুদ্ধে—ক্রীড়াঙ্গনে। গত ৫৬ বছর ধরে তিনি ভারত্তোলন শিল্পের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৯২ সাল থেকে এরশাদনগর শরীরচর্চা ভারত্তোলন ক্লাবের মাধ্যমে তিনি তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান ভারত্তোলন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র'।
নারী ভারত্তোলনের পথিকৃৎ
বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে নারী ক্রীড়াবিদ তৈরিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো 'মহিলা ভারত্তোলন দল' গঠন করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আজ সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপিসহ বিভিন্ন সংস্থায় তাঁর হাতে গড়া শত শত নারী-পুরুষ খেলোয়াড় সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের দূত
কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি এক পরিচিত নাম।
কাতারে অনুষ্ঠিত ১ম এশিয়ান মাস্টার্স ভারত্তোলন প্রতিযোগিতা -২০২৫ এ ৮৩ বছর বয়সে স্বর্ণপদক জিতে তাক লাগিয়ে দেন বিশ্বকে।
আমেরিকার লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ -২০২৫ এ লক্ষাধিক প্রতিযোগীর মধ্যে অর্জন করেন দ্বিতীয় স্থান।
২০১৩ সালে কাতার কাপ এ কোচের দায়িত্ব পালন করেন। এস এ গেমস ২০১৬ সাল ভারত ও এসএ গেমস: ২০১৯ সালে নেপালের পোখরায় এসএ গেমসে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন করেন।
সাফল্যের মুকুটে সাম্প্রতিক পালক
তাঁর নিপুণ নির্দেশনায় ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে টানা শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে তাঁর দল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় সিনিয়র, জুনিয়র এবং ইয়ুথ—প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই তাঁর দলগত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এখন পর্যন্ত ১০ বার চ্যাম্পিয়ন ৪ বার রানার্সআপ ও ৩ বার দ্বিতীয় রানার্সআপ হয় তার এই ভারোওোলন প্রশিক্ষন কেন্দ্র ।
অদম্য এক অনুপ্রেরণা
প্রতিদিন ভোরে যখন তরুণরা ঘুম থেকে উঠতে আলস্য বোধ করে, তখন ৮৪ বছরের এই বৃদ্ধকে দেখা যায় জিমের ভারী ওজন নিয়ে কসরত করতে। তাঁর এই সুস্বাস্থ্যের রহস্য সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আর অটুট দেশপ্রেম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান কেবল একজন ক্রীড়াবিদ নন, তিনি একটি আদর্শ। যিনি একাত্তরে দেশ স্বাধীন করেছেন আর আজ স্বাধীন দেশে সুস্থ ও সবল প্রজন্ম গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। মহান রাব্বুল আলামিন এই কৃতি সন্তানকে সুস্থতা ও মর্যাদাপূর্ণ দীর্ঘ জীবন দান করুন—আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে এটাই দেশবাসীর প্রার্থনা।
