ভয়ংকর দৃশ্য! হাজার হাজার একরের ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলা হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গাছের কাণ্ড, পুড়িয়ে ফেলা ডালপালা ও গাছের পাতারা সাক্ষী দিচ্ছে ওই দৃশ্যের।
এটিই আমাদের সোনাদিয়া দ্বীপ, যার অবস্থান কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
কিছুদিন আগেও যে বিস্তৃত এলাকা ঢাকা ছিল ঘন ম্যানগ্রোভ বনে, এখন তার বিভিন্ন দিকে নির্মাণ করা হয়েছে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতার মাটির বাঁধ।
ধ্বংসযজ্ঞের যে দৃশ্য দেখছি, তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় রোনাল্ড জোফের ১৯৮৪ সালে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য কিলিং ফিল্ডস’-এর কথা। এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে খেমার রুজের শাসনকালে কম্বোডিয়ার বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যে দেখা যায়—গাছের ভাঙা ডালপালা ও অবশিষ্টাংশের সঙ্গে অসংখ্য লাশের স্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এখানে-সেখানে।
সোনাদিয়া দ্বীপে নির্বিচারে গাছ কাটা চলচ্চিত্রে দেখানো তেমনই একটি ভৌতিক দৃশ্যের মতোই—যা বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে বহুলাংশে।
সোনাদিয়ায় মাটির বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছে নদীর তীর ঘেঁষে। কয়েকশ গজ পরপর বসানো হয়েছে স্লুইস গেট, যাতে লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকতে পারে। বাঁধগুলোর নকশা এমনভাবে করা যাতে বাগদা চিংড়ির ঘেরগুলোয় লবণাক্ত পানি ধরে রাখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান ও কানাডার উচ্চ চাহিদার সামুদ্রিক খাদ্যের বাজারে রপ্তানি হয় এখানকার চিংড়ি।
দ্বীপটির উত্তর-দক্ষিণ বরাবর তৈরি মাটির বাঁধের পশ্চিম দিকের ম্যানগ্রোভ বন বেশ কিছুদিন আগেই কাটা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আর পূর্ব দিকের গাছগুলো কাটা হয়েছে সম্প্রতি। সেগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। বোঝা যাচ্ছে কেটে রাখা এসব গাছ শিগগিরই পুড়িয়ে ফেলা হবে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত সোনাদিয়া ম্যানগ্রোভ বনের ধ্বংসযজ্ঞের একটি সামগ্রিক অবস্থা দেখা গেলেও, আমাদের ড্রোন ফুটেজে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে।
দেখে মনে হচ্ছে সোনাদিয়া দ্বীপটি ধীরে ধীরে সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আর উন্মোচিত হচ্ছে লালচে এক ভূখণ্ডের। যা এই দ্বীপে প্রতিনিয়ত ম্যানগ্রোভ বন নিধন ও পোড়ানোর সাক্ষ্য বহন করে। একসময় উপকূলের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ বনের বেষ্টনী ছিল। যা এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বিস্তৃত একটি সরু খাল দ্বীপটিকে মহেশখালী থেকে পৃথক করেছে।
খালের পাড় ধরে কিছু সবুজ গাছপালা অবশিষ্ট আছে। ওই খালের পাশে মাটির বাঁধ ঘেঁষে কিছু মানুষকে জমিতে কাজ করতে দেখি। ভয় আর কৌতূহল নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাই। আমরা শুনেছি, সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন এলাকা দখল করার জন্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সশস্ত্র দল ও ভাড়াটে গুন্ডাদের ব্যবহার করে। তাই কোনো ধরনের হামলার শিকার হলে যাতে দ্রুত নৌকায় করে নিরাপদে ফিরে যেতে পারি, সেজন্য আমাদের অভিজ্ঞ ট্রলারচালককে ইঞ্জিন চালু রাখতে বলি।
কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টোটা। আমরা কাছে যেতেই লোকজন মাটির বাঁধ ধরে সরে যেতে থাকে এবং এক সময় তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর আমরা আরও কাছে গিয়ে দেখি, দূর থেকে যাকে ‘কিলিং ফিল্ড’ মনে হচ্ছিলো তা নোনাপানি আটকে রেখে গড়া চিংড়ি খামার। কাছেই একটি ছোট ঘর। ঘরটির বাইরে ঝুলিয়ে রাখা ছিল কক্সবাজারের মহেশখালীর মোরকোজুল এলাকায় ইজারাকৃত জমি-সংক্রান্ত এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের অনুলিপি।
রিট আবেদনটি স্থানীয় ইজারাদার হাজী মোস্তাক আহমেদ ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে করা। আবেদনে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি), বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ প্রশাসন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষসহ। (বেজা) বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে বিবাদী করা হয়েছে।
সহজ কথায়, আবেদনকারীরা আদালতকে আর্জিতে বলেছেন, তারা চিংড়ি চাষের জন্য আইনসম্মতভাবে জমি ইজারা নিয়েছেন। কিন্তু ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারি কর্তৃপক্ষ বা অন্য পক্ষ জমির ওপর তাদের দখল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তাই তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন—যেন ইজারা বাতিল বা নবায়ন না করার মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়া না যায়।
শুনানি শেষে হাইকোর্ট লিজের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লিজকৃত জমির ওপর আবেদনকারীদের শান্তিপূর্ণ দখল ও ভোগদখলের ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না চালাতে বিবাদীদের প্রতি নির্দেশনা জারি করেন। একইসঙ্গে আবেদনকারীদের উত্থাপিত লিজ নবায়নের বিষয়টিও আদালত বিবেচনা করেন।
সর্বশেষ গত ২ মার্চ দেওয়া আদেশ অনুযায়ী, আদালত তার পূর্ববর্তী সুরক্ষা আদেশের মেয়াদ ওই তারিখ থেকে আরও ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি করেন। এর ফলে, আদালতের আদেশ পরিবর্তন না হলে আবেদনকারীরা এই বর্ধিত সময়ের মধ্যে লিজকৃত জমি দখলে রেখে ব্যবহার করতে পারবেন।
আইনি নথিতে লিজকৃত জমির পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে উত্তর দিকে যতদূর চোখ যায়, ততদূর পর্যন্ত ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করা হয়েছে। দেখে মনে হয়, এলাকাটির ওপর রাষ্ট্র বা তার সংস্থাগুলোর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। বরং অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে, ভয় আর পেশিশক্তি যাদের মূল অস্ত্র।
আমরা ট্রলারে ফিরে আসি এবং বদরখালী খাল ধরে উত্তর-পশ্চিমে এগিয়ে যাই। চিংড়িচাষের জন্য খালের দুই ধারে কাদামাটির বাঁধ। লবণাক্ত পানি প্রবেশের সুযোগ করে দিতে বাঁধ কেটে মাঝে মাঝে স্লুইস গেট বসানো হয়েছে।
তখন জোয়ারের সময়। চারপাশের দৃশ্য দেখে আমরা হতবাক। খালের দুই পাশে বাঁধের ভেতরের গাছপালা কেটে সাফ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় মাটির কালো দাগ, কেটে ফেলা গাছগুলো পোড়ানোর নিদারুণ সাক্ষী দিচ্ছে।
আরও কিছুদূর সামনে যেতেই ডান দিকে সদ্য উজাড় করা ও আগুনে পোড়ানো বিস্তীর্ণ এক এলাকা চোখে পড়ে। আমরা ট্রলার থেকে নেমে পড়ি। এটা কি সত্যিই সম্ভব? অল্প কিছুদিন আগেও এখানে ছিল ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, যা কেটে ফেলার পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নদী তীরের বাঁধটি থেকে উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে আরও নতুন নতুন বাঁধ তোলা হয়েছে, যা পুরো ভূখণ্ডটিকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করেছে।
আমরা এমনই এক বাঁধ ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকি। ডান পাশে আর কোনো সবুজ অবশিষ্ট নেই। প্রতিটি গাছ কেটে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে শুধু অজস্র শ্বাসমূল—হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বনের বোবা সাক্ষী।
বাঁধের পশ্চিম পাশে তখনো গাছ কাটা হচ্ছিল। দূর থেকে কয়েকজন মানুষকে এ কাজ করতে দেখি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েই দ্রুত তারা চোখের আড়াল হয়ে যায়। আরও উত্তরে এগিয়ে এমন একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছাই, যেখানে বড় একটি জায়গা থেকে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। কাটা গাছগুলো পড়ে থাকতে থাকতে শুকিয়ে গেছে। এক জায়গায় আগুন দেওয়ার চিহ্নও দেখতে পাই।
এরপর আমরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছাই, যা আমাদের সম্পূর্ণভাবে হতবাক করে দেয়। ডান ও বাম উভয় দিকে কাদামাটির বাঁধ। গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে শুকানোর জন্য। সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বনে সুন্দরবনের মতো লম্বা ও বিশাল আকারের গাছ হয় না। এই বনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গাছগুলো হলো কম উচ্চতার বাইন, কেওড়া ও গেওয়া।
প্রখর রোদ, চারদিকে সুনসান নীরবতা। আমাদের আর সামনে এগোনোর সাহস হলো না। আমার সঙ্গী স্থানীয় সাংবাদিক কায়সার হামিদ অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। চারপাশে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা ট্রলারে ফিরে আসি।
আমরা এবার বদরখালী খাল ধরে আরও পশ্চিমে এগিয়ে বাম দিকের নতুন একটি খালে প্রবেশ করি। বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর দেখতে পাই, এখানে এখনো কিছু সবুজ অবশিষ্ট রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রেও এমনটা দেখা গিয়েছিল। একটা বড় জায়গায় অবশ্য চিংড়ি ঘের করার জন্য সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কাদামাটির বাঁধ দিয়ে জমিটি ঘিরে রাখা হয়েছে। বন উজাড়ের এই ঘটনাটিও ঘটেছে খুব সম্প্রতি। চারদিকে অসংখ্য শুকনো ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আমি কখনো কল্পনাও করিনি এমন একটি দৃশ্য দেখব।
সংকটের গভীরে
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্র জানায়, কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ২০১৬ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করেন। পরে ২০১৮ সালে আরও ১২ হাজার ২৭০ দশমিক ০০৮ একর জমি হস্তান্তর করা হয়।
সূত্রমতে, মন্ত্রিসভার এক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক এসব জমি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। হস্তান্তর করা জমির মধ্যে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাও (ইসিএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের সময় পর্যটন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বেজার কাছে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব পর্যটন পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘বেজার কাছে জমি হস্তান্তরের ফলে দুর্বৃত্তচক্র এলাকাটি দখল করার সুযোগ পায়। তারা গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করে সেখানে চিংড়ি চাষ শুরু করে। জমি হস্তান্তরের পর বন বিভাগ সোনাদিয়া কার্যালয় বন্ধ ও টহল কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়।’
আমীর চৌধুরী আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বন আইন, ১৯২৭-এর ধারা ৪ ও ৬ অনুসারে বেজার কাছ থেকে ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর জমি ফেরত নেয়। তবে এই ধারা দুটি ওই জমির ওপর বন বিভাগকে সীমিত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়। বেজা অবশিষ্ট জমি ফেরত দিতে এখনো অনিচ্ছুক।
তিনি আরও বলেন, ‘একবার জমি দখল হয়ে গেলে ও সন্ত্রাসী চক্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে আমাদের করার মতো তেমন কিছুই থাকে না।’
বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের আরেক কর্মকর্তাও বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট স্থানীয় ও বহিরাগত প্রভাবশালী মহল চিংড়ি ঘের তৈরির জন্য ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলেছে।’
অসহায়ের মতো এই ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে দ্বীপটির স্থানীয়দের এবং তা আজও অব্যাহত আছে।
সোনাদিয়া দ্বীপে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বন জন্মালেও ১৯৭৩ সাল থেকে বন বিভাগ এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ শুরু করে। বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০১৬ সাল নাগাদ সংস্থাটি সেখানে প্রায় ৫ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে সোনাদিয়ার বনভূমি বন আইন, ১৯২৭-এর ধারা ৪-এর আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বন বিভাগের ২০১৪ সালের প্রস্তাব অনুযায়ী, ৮ হাজার ১ দশমিক ৭০ একর বনভূমিকে ‘সংরক্ষিত বন’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
সোনাদিয়া দ্বীপে যা ঘটেছে, তা কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশের ধ্বংসই নয়, বরং প্রকৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। বিশেষ করে জেলেরা, যাদের জীবিকা এখানকার নাজুক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
একইসঙ্গে এটি রাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়; এমন সংগঠিত ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা আন্তরিক? সেটিই এখন প্রমাণের সময় এসেছে।
ভোক্তা দেশগুলোকেও এ দায় থেকে মুক্ত করা যায় না। বিশ্ববাজারে চিংড়ির ক্রমবর্ধমান চাহিদাই সোনাদিয়া, চকরিয়া, সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চচাহিদাই চিংড়িকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচনায় নিতে সরকারকে উৎসাহিত করেছে।
বিশ্ববাজারে চিংড়ির চাহিদা যত বাড়বে ও রাষ্ট্র যতদিন নীরব থাকবে, ততদিন সোনাদিয়ার অবশিষ্ট ম্যানগ্রোভ বন টিকে থাকার আশা ক্ষীণই থেকে যাবে। তবে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন কেবল একটি উপকূলীয় বনভূমি নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভিত্তি। এই ম্যানগ্রোভ বন মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়াসহ নানা সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন ও বেড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল, যা স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তাকেও নিরাপদ রাখে।
দ্বীপটির কাদাময় চরভূমি ও বালুর সৈকতের সঙ্গে মিলে এই ম্যানগ্রোভ বন ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্যের অনেক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার উপকূলীয় পরিযায়ী পাখি, যারা পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়া পরিযান পথ (ইস্ট এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়ান ফ্লাইওয়ে) ধরে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এখানে আসে। বিশেষ করে পৃথিবীর অন্যতম বিরল ও মহাবিপন্ন পাখি, স্পুন-বিলড স্যান্ডপাইপারের জন্য সোনাদিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এছাড়া আরও বেশ কিছু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণিও এ এলাকার ওপর নির্ভরশীল।
ম্যানগ্রোভ বন উপকূলকে স্থিতিশীল রাখে, ভাঙন কমায় এবং ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে নিচু জায়গাগুলোকে সুরক্ষা দেয়। একইসঙ্গে পাখিপ্রেমী, গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে, যা সোনাদিয়ায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়ায়। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জীবিকা টিকিয়ে রাখা ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ অপরিহার্য।
কিন্তু সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের আশা ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ২০২৬ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসেও সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এই বন ধ্বংস এবং চিংড়ি চাষের জন্য বনভূমি দখলের ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অসাধু চক্রগুলোকে এখনো থামানো যায়নি।
বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের পাখি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল গবেষক ড. সায়েম ইউ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার মানে শুধু গাছ লাগানো নয়। এর জন্য জানতে হবে কেন মূল ম্যানগ্রোভ বন হারিয়ে গেছে এবং প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ পুনঃস্থাপন করে, নতুন করে বনের ক্ষতিসাধন বন্ধ করে উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে জন্মানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রধান বন সংরক্ষক আমীর বলেন, ‘আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমরা চকরিয়ার বন ধ্বংস হওয়া প্রত্যক্ষ করেছি যেভাবে, আজ সোনাদিয়ায় ঠিক একই ঘটনা ঘটছে। সরকার যদি ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসকারী চিংড়িচাষিদের উচ্ছেদ করতে পারে, তাহলে আমরা সম্ভবত সোনাদিয়ার ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনতে পারব।’
