মাধব চন্দ্র মন্ডল
বাউল গান বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত সংগীতের একটি অনন্য ধারা। এটি বাউল সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাধনগীতি। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মাটি আর মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা একাত্ম হয়ে ফুটে ওঠে বাউল গানে। আরও ফুটে ওঠে সাম্য ও মানবতার বাণী। এ ধারাটি পুষ্ট হয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীর তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের ভাব, রাধাকৃষ্ণবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও সুফি দর্শনের প্রভাবে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, বাংলাদেশে বাউল মতের উদ্ভব সতেরো শতকে। এ মতের প্রবর্তক হলেন আউল চাঁদ ও মাধব বিবি। গবেষকদের মতে, নিজ দেহের মধ্যে ঈশ্বরকে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা থেকে বাউল ধারার সৃষ্টি।
বাউল গানের সঙ্গে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সম্পর্ক অতি নিবিড়। প্রথমে 'শখের বাউল' হিসেবে তাঁর আবির্ভাব হলেও শেষ পর্যন্ত এই বাউল গানের মধ্যেই হরিনাথ তাঁর সাধন অস্তিত্ব অনুভব করেন এবং তাঁর শিল্প শক্তির যথার্থ পরিচয়ও এই মাধ্যমেই পাওয়া যায়। হরিনাথ বাউল গানের একটি 'ঘরানা' সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি 'কাঙাল' ও 'ফিকিরচাঁদ' ভণিতায় পরমার্থসূচক যে সব বাউলগের গান রচনা করেছেন তার সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে, লালন নিজেকে তাঁর গানে 'ফকির লালন' বলেছেন ঠিক তেমনি একজন সত্যিকারে বাউল হিসেবে হরিনাথও 'কাঙাল' শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে।
বাউল গানকে কতটা হৃদয়ে ধারণ করলে বাংলা ১২৮৭ সালে ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউলগানের দল গঠিত হয়। এই হরিনাথের গানের দলকে ওই সময় লোকে 'ভূতের দল'ও বলত। কাঙাল হরিনাথের এই দল গঠন ও বাউলগান রচনার প্রেরণা এসেছিল বাউলসাধক লালন ফকিরের নিকট থেকে। লালনের সাথে হরিনাথের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন অন্তরঙ্গতার কারণেই ফকির লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল কুটিরে আসতেন। কাঙালও ছেঁউড়িয়া ফকির লালনের আখড়ায় আসর জমাতেন। এভাবেই একদিন ফকির লালন কাঙাল কুটিরে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করার পর হরিনাথের শিষ্যদের মনে তা গভীরভাবে দাগ কাটে।
সেই পরিপ্রেক্ষিতেই অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র প্রস্তাব মতো একটা বাউলের দল গঠনের চিন্তা সকলকে আলোড়িত করে এবং তা কার্যকর করার জন্য 'ফিকিরচাঁদ' ভণিতা দিয়ে গান রচনা করা হয় 'ভাব মন দিবানিশি, সত্য পথের সেই ভাবনা।' 'গ্রামবার্তা'র সহযোগী ও ছাপাখানার কর্মীদের এই অভিনব 'ফিকির' হরিনাথের সংগ্রহ অনুমোদনই শুধু লাভ করল না, কাঙাল স্বয়ং গান রচনার উদ্যোগী হলেন। তার পর কাঙাল হরিনাথ তার জীবনের প্রথম গান লিখলেন, 'আমি কোরব এ রাখালী কতকাল পালের ড্যা গরু ছুটে, কোরেছে আমায় হাল বেহাল।' এরপর হরিনাথের মনে গানের জোয়ার বয়ে গেল, একের পর এক লিখতে থাকলেন মন মাতানো সব বাউল গান।
কাঙাল হরিনাথের বাউল গান তার সমকালে সমগ্র বাংলাদেশকে আন্দোলিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কাঙাল গানের জন্য কোন পারিশ্রমিক নেন নি। তবে গানকে এতটা ভালোবেসে ছিলেন যে কেউ যদি বলতো তার বাড়িতে গানে আসর বসাতে হবে তবে তিনি সেখানেই চলে যেতেন।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার
বর্তমান সময়ের শিল্পীদের মতো নয়, কারণ তার ভেতর শিল্পবোধ ছিলো। মনের খোরাক হিসেবে গানকে বেছে নিয়েছিলেন। কাঙালদের গান জনচিত্তে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল। জলধর সেনের সাক্ষ্যে জানা যায়, বাংলার অবিস্মরণীয় লোকসঙ্গীত শিল্পী পাগলা কানাইয়ের গানের পাশাপাশি কাঙালের গানও স্থান করে নিতে পেরেছিল। কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের ভক্তি আশ্রিত সঙ্গীত রচনার অন্যতম প্রেরণাও যে কাঙাল হরিনাথ, সে সম্পর্কে ড. সুকুমার সেনের মন্তব্য: রজনীকান্ত সেন ভক্তিঙ্গের গানের প্রেরণা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান এবং কাঙাল হরিনাথের বাউঙ্গান হইতে।...রজনীকান্তের কোন কোন গানে 'কান্ত' ভণিতা দেখা যায়।
এই ভণিতা দেয়ার রীতি হরিনাথের রনানুসূত্রে পাওয়া। শুধু তাই নয়, কাঙালের বাউলগান বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও স্পর্শ করেছিল। হরিনাথের ফিকিরচাঁদের গানের দলের অনুকরণে কুমারখালি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যা মীর মশাররফ হোসেনের সূত্রে জানা যায়: নদীয়া জেলার অন্ত:পাতি কুমারখালিতে ফিকিরচাঁদ ফকিরের আবির্ভাব হয়। এর দেখাদেখি আজবচাঁদ, রশিকচাঁদ দেখা দেন। 'কাঙাল-ফিকিরচাঁদ ফকিরের গীতাবলী' ও 'কাঙাল-ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউসঙ্গীত' গ্রন্থে কয়েকশত গান পাওয়া যায়। কাঙালের অন্যান্য গ্রন্থেও ('ব্রহ্মাণ্ডবেদ', 'মাতৃমহিমা' ইত্যাদি) তার অনেক গান মুদ্রিত হয়েছে। অনুমান করা চলে, তার গান প্রায় হাজারের কাছাকাছি হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেশমকুঠির কর্ম সূত্রে তিলি সম্প্রদায়ের অনেক লোক কুমারখালিতে এসে বসতি স্থাপন করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর বিত্তের অধিকারী হয়ে ক্রমশ সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করেন। তখন থেকেই কুমারখালীর আর্থসামাজিক জীবনে তিলি জাতিরই প্রাধান্য ছিল।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত কুমারখালীর এই তিলি মজুমদার বংশের এক দরিদ্র খাঁচায় ১২৪০ বঙ্গাব্দের ৫ই শ্রাবণ (১৮৩৩ সালের ২৩ই জুলাই) অমাবস্যা তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। হরিনাথ কমলিনী দেবী ও হলধর মজুমদারের একমাত্র পুত্র। শৈশবেই হরিনাথের মাতৃ ও পিতৃবিয়োগ ঘটে। অপরিসীম দারিদ্র ও দুঃখ-কষ্টের ভেতর দিয়ে তার জীবন শুরু। অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয়ের অভাব তাকে শৈশবেই 'কাঙাল' করেছিল।
[লেখক: কবি ও শিক্ষক]
