বিপন্ন ভোঁদড় প্রাণী, সম্প্রদায়, চিত্রা নদী নিরাপদ থাকুক"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নড়াইল সদর উপজেলার গোয়ালবাড়ি বর্মনপাড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে প্রথমবারের মতো পালিত হয়েছে বিশ্ব ভোঁদড় দিবস। স্থানীয় বর্মন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, ভোঁদড় সংরক্ষণ, পরিবেশ সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একসূত্রে গেঁথে আয়োজনটি পরিণত হয় ব্যতিক্রমী এক মিলনমেলায়।
স্টাফ রিপোর্টার : নড়াইল সদর উপজেলার গোয়ালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শনিবার (২৭ জুন) উৎসবমুখর পরিবেশে প্রথমবারের মতো পালিত হয়েছে বিশ্ব ভোঁদড় দিবস। "বিপন্ন ভোঁদড় প্রাণী, সম্প্রদায়, চিত্রা নদী নিরাপদ থাকুক"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ভোঁদড় সংরক্ষণ, নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ঐতিহ্যবাহী বর্মন সম্প্রদায়ের জীবন-সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়।
দিবসটির উদ্যোক্তা শামসুল ইসলাম স্বপন জানান, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে ঢাকা থেকে এসে গোয়ালবাড়ি এলাকায় ভোঁদড় ও বর্মন সম্প্রদায়ের জীবনযাপন নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রথমবারের মতো রাজধানীর পরিবর্তে ভোঁদড় নির্ভর ঐতিহ্যবাহী জনপদ গোয়ালবাড়িতেই বিশ্ব ভোঁদড় দিবস আয়োজনের উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন,"বাংলাদেশে এই দিবসটি প্রথমবার আমরা আয়োজন করছি। ঢাকায় নয়, যেখানে মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোঁদড়কে সঙ্গী করে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করে আসছে, সেই গোয়ালবাড়িতেই দিবসটি পালন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।"
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিত্রা নদীকেন্দ্রিক এই জনপদে ভোঁদড় ও বর্মন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের গবেষক, পর্যটক ও গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন তথ্যচিত্র, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও এ এলাকার মানুষ ও প্রশিক্ষিত ভোঁদড়ের জীবনচিত্র তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান আলেক। এছাড়াও শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিশ্ব ভোঁদড় দিবস উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ভোঁদড়ের জীবনভিত্তিক পটগানসহ বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে ভোঁদড় সংরক্ষণ, নদী রক্ষা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম গোয়ালবাড়ি বর্মন সম্প্রদায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, এই জনপদের যেসব উন্নয়ন এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। পাশাপাশি প্রতি বছর আরও জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিশ্ব ভোঁদড় দিবস আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
এ সময় তিনি বর্মন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠান শেষে সংসদ সদস্য চিত্রা নদীর তীরে গিয়ে প্রশিক্ষিত ভোঁদড়ের মাছ ধরার কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি কিছু সময় সেখানে অবস্থান করে ভোঁদড় ও মানুষের সহাবস্থানের বাস্তব চিত্র উপভোগ করেন।
পরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিশুদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। সমাপনী আয়োজন হিসেবে পরিবেশিত হয় ভোঁদড় ও বর্মন সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পটগান, যা উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, বিশ্ব ভোঁদড় দিবসের এই আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়; বরং চিত্রা নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিপন্ন ভোঁদড় রক্ষা এবং বর্মন সম্প্রদায়ের শতবর্ষের ঐতিহ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানটির আয়োজনে ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে ইন্টারন্যাশনাল সারভাইভাল ফান্ড (International Survival Fund), ইউনিসেফ বাংলাদেশ (UNICEF Bangladesh), ওয়াটার ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া, মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, যারা আয়োজনটির প্রচার ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্ব ভোঁদড় দিবস নড়াইল চিত্রা নদীর ভোঁদড় গোয়ালবাড়ি বর্মন সম্প্রদায় ভোঁদড় সংরক্ষণ বাংলাদেশ নড়াইল সংবাদ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
